জেরেমি করবিন ইন বাট লেবার আউট

Barrister-Abul-Kalam-Chowdhব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরীঃ ইউরোপের গণভোটের পর গোটা ব্রিটেনের রাজনীতিযে একটি বিশাল পরিবর্তন লক্ষণীয়। প্রায় মার্জিনাল ভোটে লিভ পাশ করার পর ব্রিটেনের জনগণ যে ইউরোপ নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত সেটা পরিষ্কার। আর এই দ্বিধা বিভক্ত জাতিকে নেতৃত্ব দেয়া এবং ইউরোপ থেকে বের হওয়া নিয়ে রাজনীতিবিদদের মতো সাধারণ মানুষ ও তটস্থ। গণভোট পরিবর্তিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বুঝা যায় ইউরোপ থেকে বাহির হওয়ার জন্য আমাদের লিভ ঘরনার রাজনীতিবিদদের যেমন যথেষ্ট হোম ওয়ার্ক ছিলনা, ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষের ও যথেষ্ট ধারণা ছিলনা। তাই লক্ষহীন গন্তব্য নিয়ে যখন সবাই দিশেহারা ঠিক তখন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড কেমেরুন পদত্যাগ করেন আর তাকে অনুসরণ করেন লিভ গ্রূপের প্রধান ক্রীড়নক বরিস জনসন। ইউরোপ কেম্পাইন নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত টোরি পার্টিতে এই দুই পদত্যাগ যুক্ত করে আরেক নতুন মাত্রা। টোরি পার্টির অবস্থা হয়ে যায় লেজে গোবরে। আপাত দৃষ্টিতে তখন মনে হয়েছিল টোরি পার্টি ঘুরে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগবে। রাজনীতির সুবাতাস তখন স্বাভাবিক ভাবে গিয়ে পড়ে লেবার দলের উপর। বিভক্ত আর হতাশাগ্রস্ত জাতি তখন চরম আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো লেবার দলের উপর। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনেও আসার সঞ্চার হয়েছিলো – লেবারই হলো একমাত্র দল যে কিনা এই কঠিন এবং সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারবে। কিন্তু বিধিবাম। বাস্তবে কিন্তু ঘটলো তার ঠিক উল্টো।

লেবার দলীয় ভাবে ইউরোপে থাকার পক্ষের দল। তাই ইউরোপের গণভোটের ফলাফলের ভরাডুবির সকল দায়বার গিয়ে পড়লো জেরেমি কোরবিনের উপর আর তখনই বেঁকে বসলেন বেশিরভাগ দলীয় এমপি। প্রথমে তারা আহবান জানান জেরেমিকে পদ ছেড়ে চলে যেতে, যখন তিনি অস্বীকার করলেন তখন একে একে বেশির ভাগ সদস্য ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে বসেন। করবিনের নতুন নিয়োগ আর পদত্যাগ নাটকের মধ্যে লেবার দলীয় সংসদ সদস্যদের ১৭২ v ৪০ জন এমপি করবিনের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। রাজনীতির রীতি অনুযায়ী তখন এই পর্যায়ে একজন নেতার নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্যতা থাকে না। গণতান্ত্ৰিক কিংবা শাসনতান্ত্রিক পদ্বতিতে সম্ভব হলেও
বাস্তবতার নিরিখে কতটুকু সমীচীন তা রীতিমত গবেষণার বিষয়। তবে এ ক্ষেত্রে জেরেমি করবিনের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট – “আমি সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত, সুতরাং এমপিরা কে কি বললো, আমার যায় আসেনা”। যদি ও এমপিরা সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত! উল্লেখ্য জেরেমির বিরুদ্বে অনেক এমপি ভোট দিয়েছেন যারা কিনা বিগত দিনে জেরেমির নেতা হওয়ার একনিষ্ট সমর্থক ছিলেন। লেবার দলের অনেক বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তি যাদের টাকায় দল পরিচালিত হয় যেমন এলান সোগার, পরিবর্তন না হলে দলকে ভবিষ্যতে কোন ধরণের অর্থিক সহযোগিতা না করার ঘোষণা দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো – এমপি কিংবা এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হটাৎ জেরেমি বিদ্বেষী হওয়ার কারণ কি?

জেরেমি যে আগে গোড়া একজন ভালো মানুষ এতে কোন সন্দেহ নাই।আর এজন্য প্রশ্ন জাগে – এতো ভালো একজন মানুষের বিরুদ্বে এতো ক্ষোভ হওয়ার কারণ কি?

জেরেমির বিরুদ্বে শুরু থেকে যে অভিযোগ ছিলো উনি দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেননা। নেতৃত্ব হলো সবাইকে একটি টিম ওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে সম্মিলিত ভাবে চলা। জেরেমি শুরু থেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকে বলেন জেরেমির বিরুধী পক্ষ শুরু থেকে পদে পদে তাকে নাজেহাল করছেন। আমার বক্তব্য স্পষ্ট – নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ থাকা খুবই স্বাভাবিক, নেতাকে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রমান করতে হবে তার নেতৃত্বের পরিপক্ষতা। জেরেমি এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন জেরেমির নেতৃত্বে গত নয় মাসে সবকটি নির্বাচনে দল জয়লাভ করেছে সুতরাং তিনিই যোগ্য। কথা হলো লন্ডনের মেয়র সাদিক খান শুধু লেবারের ভোটে পাশ করেছেন বললে ভুল হবে, এখানে টোরি পার্টির ও অনেক ভূমিকা ছিল। প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্বাচন কম্পাইন সব ক্ষেত্রে তারা ভুল পথে ছিল। তার উপর অর্থনৈতিক বাজেট কাট, ছাত্রদের টিউশন ফি এবং জীবন যাত্রার উপর অস্বাভাবিক অর্থিক চাপে মানুষ ছিল অতিষ্ট। যা নির্বাচনের উপর প্রভাব পড়ে সরাসরি। সুতরাং এই জয়লাভে শুধুমাত্ৰ জেরেমির কৃতিত্ব চিন্তা করা চরম ভুল।
লেবার দলগত ভাবে ইউরোপের পক্ষের দল, আর জেরেমি ব্যক্তিগত ভাবে ইউরোপের বিপক্ষের মানুষ। আর এটাই হলো জেরেমির সবচেয়ে বড় সমস্যা।

জেরেমির বিরুদ্বে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো উনি ইউরোপ কেম্পাইনে প্রকাশ্যে ইউরোপের সাথে থাকার পক্ষপাতি হলেও বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। উনার বিরুদ্বে অভিযোগ হলো – উনি ইন কেম্পাইনের প্রধান এলান জনসনের সাথে ক্যাম্পাইনের ব্যাপারে সবসময় দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। এমনকি এলান গণভোটের আগে দলের দিকনির্দেশনা মূলক আলাপ আলোচনার জন্য জেরেমির সাথে দেখা করতে কিংবা বসতে চাইলে তাকে উনি কখনোই পর্যাপ্ত সময় এবং দিক নির্দেশনা দেননি। শুধু তাই নয় গণভোটের ঠিক কিছুদিন আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন নির্বাচনের কৌশল নিয়ে জেরেমির সাথে বসতে চাইলে তাকে নাকি সময় দেয়া হয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর। আর দলের কেম্পাইনকে খাটো করার জন্য দলের ইউরোপের মেনুফেস্টোতে অনেক গুরুত্ব পূর্ণ ইস্যূকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। সবমিলে বেশিরভাগ এমপি তার বিরুদ্বে ক্ষেপে উঠেন। যদি অভিযোগ গুলো পুরোপুরি সত্য হয় তাহলে উনি পুরো দলের স্পিরিটের বিরুদ্বে কাজ করেছেন, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই তিনি নিজেই তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ব করেছেন। ইউরোপ ইস্যু নিয়ে তিনি লেবার দল এবং দ্বিধা বিভক্ত জাতিকে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

সবচেয়ে মজার বিষয় শত অনুরুধ, আবেদন, নিবেদন এবং এমপিদের ভোটাভুটি প্রত্যাখান করে যখন জেরেমি পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে অতল, তখন দলীয় সিদ্ধান্ত হয় নতুন ভাবে নেতা নির্বাচনের। জেরেমি তখন ঘোষণা দেন আবার উনি নেতৃত্বের নির্বাচনে প্রার্থী!

নতুন নির্বাচনে উনি দাঁড়ালে হয়তো সাধারণ ভোটারের ভোটে উনি আবারো জয়লাভ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো উনি কি তখন লেবার দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন? আমার এক সহকর্মীর ভাষায় – যত এমপি তার বিরুদ্বে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন তাদের সবাইকে ডিসিলেক্ট অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এতো বিপুল সংখ্যক এমপিদের ডিসিলেক্ট করে লেবার দল কিভাবে চলবে? সাধারণ ভোটাররা ভোট দিলে ও সরকার এবং বিরুধীদল চালায় এমপিরা। বেশিরভাগ এমপিদের মতামত উপেক্ষা করে জেরেমির একলা চলো নীতি হয়তো তার ব্যক্তিগত রাজনীতির জন্য মঙ্গল জনক কিন্তু দল এবং দেশের জন্য পুরোপুরি অমঙ্গলজনক। আর ক্ষতিটা ঠিক কতটুকু হবে তা শুধু সময়ই বলে দিবে।

লেখক: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সহ সভাপতি দি সোসাইটি অব ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সলিসিটর্স
প্রিন্সিপাল, কে সি সলিসিটর্স, ইউ।কে।

Sharing is caring!

Loading...
Open