স্বেচ্ছাচারী ব্রাসেলস থেকে মুক্তি চায় ব্রিটেনের বেশিরভাগ জনগন

ব্রিটেন-ইইউ বিচ্ছেদের পক্ষেই জনসমর্থণ বেশি

Brexit-Opinionরুহেল আলমঃ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাবার প্রশ্নে গণভোটের আর মাত্র আট দিন বাকি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক জোট ইইউতে ব্রিটেনের ভবিষ্যত নিয়ে ২৩ জুন যুক্তরাজ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ এ গণভোটের রায় ইউরোপের রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি অনেক বিষয়ের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাবার পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে। অতি সাম্প্রতিক জরিপগুলোর ফলাফলের ইঙ্গিত, ব্রেক্সিটের পক্ষেই রায় আসতে যাচ্ছে ২৩ জুন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রভাবশালী বৃটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান ও জরিপকারী সংস্থা আইসিএমের প্রকাশিত জরিপ ফলাফলে বলা হয়, ৬ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে আছে ইইউ বিরোধীরা। অনলাইন ও টেলিফোনে করা যৌথ এই জরিপের উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ মানুষ ইইউ ত্যাগের পক্ষে। আর ৪৭ শতাংশ মানুষ ইইউতে থাকার পক্ষে।
দি টাইমস পত্রিকা এবং ইন্টারনেট-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভ পরিচালিত যৌথ জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের ইইউয়ে থাকার পক্ষের চেয়ে ইইউ ত্যাগ করার পক্ষটি ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছে। এছাড়াও ইপসোস মরি, ওআরবি, কমরেসসহ অন্যান্য জরিপসংস্থার ফলাফলও একইরকম ইঙ্গিত দিচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা থেকেও অভিবাসন সমস্যা বড় করে দেখছেন ইইউবিরোধীরা। তাদের প্রচারে অভিবাসন সংকটকে ফোকাস করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত সংবাদপত্র দি সান পত্রিকা তার পাঠকদের ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছ। মিডিয়া মোগল খ্যাত রুপার্ট মার্ডক মালিকানাধীন দি সানে পাঠকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন ২৮ সদস্যবিশিষ্ট ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। এতে বলা হয়েছে, ‘বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে সবাইকে ভোট দিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী ব্রাসেলস থেকে আমরা অবশ্যই নিজেদের মুক্ত করব।
দি টাইমস-ইউগভের জরিপে উঠে এসেছে, এখন পর্যন্ত ইইউ ত্যাগের পক্ষে যুক্তরাজ্যের ৪৭ শতাংশ নাগরিক। আর থাকার পক্ষে ৩৯ শতাংশ। সিদ্ধান্তহীন ভোটারের সংখ্যা ১১ শতাংশ। আর ৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তারা গণভোটে অংশ নেবেন না। গত সপ্তাহে দি টাইমস-ইউগভ আরেকটি জরিপে ফল প্রকাশ করে। তাতে ইইউতে থাকার পক্ষের ভোটারা ১ শতাংশ এগিয়ে ছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে সেই ব্যবধান কমিয়ে ইইউ ছাড়ার পক্ষটি ৭ পয়েন্টে এগিয়ে গেছে। গণভোটের সময় যতই এগিয়ে আসছে, ইইউবিরোধীরা ততই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
ব্রেক্সিটের সম্ভাবনাকে উস্কে দিচ্ছে আরও একটি খবর। স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইইউতে থাকার পক্ষের প্রচারে নেতৃত্ব দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সোমবার থেকে প্রচারকাজ থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় ক্যামেরনের বক্তব্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে- এমন চিন্তা থেকেই এ সিদ্ধান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বলা বাহুল্য প্রথমত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে তাতক্ষণিকভাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা হবে। গত বছর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজেটে ব্রিটেনের অবদান ছিল ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড। আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন পেয়েছে ৪.৫ বিলিয়ন পাউন্ড। সর্বোপরি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ব্রিটেনের গচ্ছা ৮.৫ বিলিয়ন পাউন্ড। যা প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে সরকারের মোট ব্যায়ের ০৭ শতাংশ।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পার্লামেন্ট একটি অনির্বাচিত, দায়বদ্ধহীন কিন্তু তাদের ক্ষমতা অসীম। তারা প্রায়শই অনেক আইন আমাদের উপর চাপিয়ে দেয় যেগুলো আমাদের সংসদে ভোট না করে মেনে নিতে হয় এবং যা আমাদের নিজস্ব আইনকে রহিত করে।।
ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ যুক্তি যে ইউরোপ থেকে বেরিয়ে গেলে আমাদের ইউরোপিয় বাজার বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু এই দাবি মোটেই তথ্যবহুল নয়। ইউরোপ থেকে বেরিয়ে গেলে ইউরোপের সাথে ব্রিটেনের বানিজ্য কোনভাবেই বন্ধ হবে না। উদাহরণস্বরূপ আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ড ইইউ সদস্য নয় কিন্তু ইউরোপীয় ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে ইউরোপিয়ান একক বাজারে তাদের এক্সেস আছে। তাছাড়া ইউরোপিয়ান অনেক অনেক সদস্য রাজ্যের জন্য বিটেন একটি বিশাল বাজার তাই ওইসব রাজ্যের ব্রিটেনের এত বিশাল বাজারের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করা কোনভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা।
এই মূহুর্তে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে যে সকল সুবিধাঃ
১) অন্যান্য দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্যিক চুক্তির স্বাধীনতা। যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে থাকলে অসম্ভব।
২) ব্রিটেনের সম্পদ ব্রিটেনের নাগরিকদের সুবিধার্থে ব্যায় করার স্বাধীনতা, যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে থাকলে সমানভাবে ইউরোপিয়ানদের সাথে ভাগ করতে হবে।
৩) স্বাধীনভাবে ব্রিটেনের জাতীয় সিমানা নিয়ন্ত্রন করা।
৪) ব্রিটেনের বিশেষ আইনি ব্যাবস্থা পূণর্বহাল করার সম্ভাবনা।
৫) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্যায়বহুল আইনি জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা।
৬) ব্রিটেনের ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের সঞ্চয় করার স্বাধীনতা।
৭) ব্রিটিশ অর্থনীতির উন্নতি সাধন করে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃস্টি করতে পারা।
৮) ব্রিটেনের মৎস খামারগুলো পূণঃপ্রতিষ্টা লাভ করবে। যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হবার পর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
৯) পূরো ইউরোপ জূড়ে ব্রিটেনের এনএইচএসের অর্থ ব্যায় বন্ধ হবে। ইউরোপিয়ান নাগরিকদের পেছনে ব্রিটেনের ওয়েলফেয়ার ব্যায় বন্ধ হলে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড ব্রিটেনের সঞ্চয় হবে।
১০) সর্বোপরি ব্রিটেনের ঐতিহ্য ও রীতিনীতি পূণরুদ্ধার হবে যা আজ ইউরোপিয়ান মিশ্র সংস্কৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open