নানা কৌশলে ছাত্রীদের বাসায় ডেকে নিতেন লম্পট শিক্ষক ফেরদৌস

62893ডেস্ক রিপোর্টঃ পরিবার নিয়ে থাকতেন ইস্কাটনের বাসায়। শ্বশুরের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া পান্থপথের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ব্যবহার করতেন নিজেই। তবে পরিবার জানতো ওই ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া।
সেই ফ্ল্যাটে গড়ে তোলেন অন্য এক জগৎ। পড়া বোঝানো, টিউটোরিয়াল, অ্যাসাইনমেন্ট, গ্রুপ ডিসকাস, থিসিস মূল্যায়ন, চারিত্রিক সনদের নাম করে ছাত্রীদের ডেকে আনতেন এখানে। এরপর নানা কৌশলে শুরু করতেন যৌন হয়রানি। রাজি না হলেই পরীক্ষা ফেল, ড্রপ-আউট, চারিত্রিক সনদ না দেয়াসহ নানা হুমকি। কয়েকজন ছাত্রীকে সেমিস্টার ড্রপ-আউট করিয়েছেন। অভিযুক্ত এই শিক্ষকের নাম মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌস। দেশের অন্যতম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার (ইইই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তিনি। এসব অভিযোগে গত শনিবার তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষ। গতকাল ভোররাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন একজন শিক্ষার্থীর করা নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় কলাবাগান থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। গতকাল তেজগাঁওয়ে অবস্থিত আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সরজমিন গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, অপছন্দের ছাত্রদের ড্রপ-আউট, চারিত্রিক সনদের নামে হয়রানিসহ বেশকিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ ৪ দফা দাবিতে গত শনিবার থেকে করে আসা টানা আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
অভিযুক্ত ছাত্রীর সহপাঠীরা জানান, গত ২রা মার্চ দুপুর আড়াইটায় শিক্ষক ফেরদৌস ওই ছাত্রীকে পান্থপথের বিল্ডিং নং ১৫২/২/জি/১-২, ৪ নং ফ্ল্যাটের যেতে বলেন। থিসিস বোঝানোর নামে একপর্যায়ে ওই ছাত্রীর স্পর্শকাতর স্থানে হাতে দিয়ে শ্লীলতাহানি করেন ওই শিক্ষক। ওই সময় ছাত্রী ধস্তাধস্তি করে সেখানে থেকে চলে আসেন। পরে ওই শিক্ষক একটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে ভিকটিম শিক্ষার্থীর দু’টি নম্বরে অশ্লীল ও আপত্তিকর ভাষায় মেসেজ পাঠান। সেখানে হুমকি দেয়া হয়, এই বিষয়টি অভিভাবক বা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালে পরিণাম খারাপ হবে। ওই ছাত্রী পরের দিন ক্যাম্পাসে গিয়ে বিভাগের সিনিয়র দুই শিক্ষার্থী ও একজন সহপাঠীর কাছে বিষয়টি জানিয়ে পরামর্শ চান। তার শঙ্কা ছিল ফেরদৌস তার খাতায় নম্বর কমিয়ে দেয়াসহ তাকে বহিষ্কার করতে পারেন। পরে সিনিয়রদের পরামর্শে ওই ছাত্রী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে নিজের নাম উল্লেখ না করে পুরো ঘটনা লিখিত আকারে অভিযোগ করেন। চেয়ারম্যান স্বাক্ষরবিহীন এই চিঠিতে ঘটনার বর্ণনা দেখে বিব্রতবোধ করে অভিযোগটি ভিসি’র কাছে নিয়ে যান। ভিসি অভিযুক্ত শিক্ষককে ডেকে এই ঘটনার সম্পর্কে জানতে চান। ভিসি তাকে এ ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করার কথা বললেও তিনি কৌশল অবলম্বন করেন। তাৎক্ষণিক এর জবাব না দিয়ে দুইদিন সময় চান। এই দুইদিনে তিনি এই ছাত্রীসহ সম্ভাব্য সকল ছাত্রীকে ফোন করে অভিযোগ করেছে কী না জানতে চান। ছাত্রীদের এই বলে হুমকি দেন পরে অভিযোগকারী নাম জানতে পারলে আমি তাকে লাল টিসি (অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে পারবেন না) ধরিয়ে দিবো। কোনো ছাত্রী অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার না করায় দুইদিন পর তিনি ভিসি’র কাছে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। উল্টো কয়েজন ছাত্রীর নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এই ছাত্রীরা পড়াশুনা করেন না। তাদের পড়াশুনার চাপ দেয়ায় আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত এসব অভিযোগ করছে। তাৎক্ষণিত ভিসি এসব অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ আছে বলে তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। তিনি তাতে রাজি হননি। তাকে তদন্ত কমিটির কাছে এই বিষয়ের মুখোমুখি হতে হবে বলে জানান ভিসি। এতে সায় দেন ফেরদৌস। এই সুযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক তৃতীয় পক্ষ থেকে জানতে পারেন ইইই ১ম বর্ষ ২য় সেমিস্টারের এক ছাত্রী অভিযোগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এ খবর পেয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ওই ছাত্রীকে নানাভাবে হুমকি দেয়া শুরু করেন। এই ছাত্রী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বিষয়টি জানায়। এরপর গতকাল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য আসাদুল্লাহ আল সায়েম কলাবাগান থানায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। এ মামলাতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌস দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীদের সঙ্গে নানা কায়দায় যৌন হয়রানি করছিলেন। ক্লাসে পড়া বুঝানোর নামে পান্থপথে বাসায় ডাকতেন। এরপর জোরপূর্বক যৌন হয়রানি করতেন। এতে কেউ রাজি না হলে তাকে সেমিস্টারে ফেল, ইনকোর্স ও অ্যাসাইমেন্টে নম্বর কমিয়ে দেয়ার হুমকি দিতেন তার বড় অস্ত্র ছিল চারিত্রিক সনদপত্র। তার কথায় রাজি না হলেই চারিত্রিক সনদ না দেয়ার হুমকি দিতেন তিনি। কারণ তিনি সহযোগী প্রক্টরের দায়িত্ব ছিলেন। অনেক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর না থাকায় তিনি এ সুযোগটি নেন।
ভিসি’র কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব ঘটনার জানাজানি হলে গত বৃহস্পতিবার এই শিক্ষককে বহিষ্কার করতে রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দেন ভিসি। এরমধ্যে শনিবার শিক্ষার্থীরা তার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিভাগীয় চেয়ারম্যানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভিসি নিজস্ব বলয়ে একটি তদন্ত করেন। সেখানে একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ রকম যৌন হয়রানির প্রমাণ মিলে। তখনই মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখেন।
আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর এএমএম সাইফুদ্দিন গতকাল তার দপ্তরে মানবজমিনকে বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষককের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির প্রাথমিক সকল তথ্য আমাদের কাছে ছিল। স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। তাই তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তাদের রিপোর্ট পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো। তিনি বলেন, যৌন হয়রানি নয়, নৈতিক স্খলন ঘটেছে এই অভিযোগে তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে পারি। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর করবো। যাতে তিনি আর আদালতের শরণাপন্ন্ন হতে না পারেন।
কোষাধ্যক্ষ কাজী শরীফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, তার সঙ্গে কথা বললে কেউ বুঝতে পারবে না তিনি এ কাজ করতে পারেন। অথচ তিনি এত জঘন্য এ কাজে লিপ্ত ছিলেন একবারের জন্য আমরা বুঝতে পারিনি। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কলাবাগান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামীমুল আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন একজন শিক্ষার্থীর নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করেছি। সাতদিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম ২ দিনের পেয়েছি। তিনি বলেন, একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এই বিষয়টি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open