ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ : ইতিহাসের দুর্ঘটনা

12810_f1ডেস্ক রিপোর্টঃ ইতিহাসের দুর্ঘটনা। সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের বিধানকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে অবৈধ, বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে, যে সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়টি এসেছে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ থেকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক এবং বিচারপতি আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানিয়েছেন, বিচারপতি আশরাফুল কামাল ভিন্নমত পোষণ করেছেন। এ রায়ের ফলে সংবিধানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের আদি সংবিধানে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। চতুর্থ সংশোধনীতে এ ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনীতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলুপ্ত করে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আসাদুজ্জামান সিদ্দিকীসহ ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। সংশোধনী কেন বেআইনি ও সংবিধান-পরিপন্থি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে ওই বছর ৯ই নভেম্বর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চে এ রুলের ওপর প্রায় ২০ কার্যদিবস শুনানি হয়। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসি।

ইতিহাসের দুর্ঘটনা: বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে হাইকোর্ট বেঞ্চের তিন বিচারক আসন গ্রহণ করেন। প্রায় আধঘণ্টা সময়ে রায়ের অপারেটিভ অংশটুকু ঘোষণা করেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। শুরুতেই তিনি জানান, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে দেয়া রায়। রায়ে বলা হয়েছে, সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের বিধান ইতিহাসের দুর্ঘটনামাত্র, যদিও পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে তা বিদ্যমান। কমনওয়েলভুক্ত মেজরিটি দেশে সংসদের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ করা হয় না। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আমাদের দেশের সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। দল যে সিদ্ধান্ত নেয় সে পক্ষেই তাদের ভোট দিতে হয়, এমনকি তারা যদি বিষয়টি সঠিক মনে নাও করেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বহাল থাকলে বিচারপতিদের সংসদ সদস্যদের করুণা প্রার্থী হতে হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ওইসব দেশের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আমাদের সংসদ সদস্যদের মেলানো ঠিক হবে না। ওইসব দেশের সংসদ সদস্যরা সংসদে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৯৫(২) সি অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে। ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, কোনো সরকার এই আইন করেনি। এ ব্যাপারে আমরাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একমত পোষণ করি। ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে অবস্থান ব্যক্ত করতে গিয়ে হাইকোর্ট বলেন, প্রথমত কোনো জাতীয় ইস্যুতে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজ বিভাজিত। তৃতীয়ত, ক্ষমতায় থাকা দলের সব সময় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নাও থাকতে পারে।
সংসদের মাধ্যমে বিচারক অপসারণে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ভারতে সৃষ্ট জটিলতার উদাহরণ টেনে আদালত বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর কারণে আমাদের দেশেও এ ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে হেয় করা এবং নাজুক অবস্থায় ফেলা হয়েছে। আদালত এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। বিচারপতি অপসারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থার প্রতিও সায় দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বলেন, বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে সংশোধনীর বিষয়ে জনগণের ধারণা কি? এটা যদি জনগণ মনে করেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই তাহলে বিচার বিভাগ টিকতে পারে না। ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি-পরিপন্থি। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হলো।

টিকে গেল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল: জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে। প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণ দুই বিচারপতির সমন্বয়ে এ কাউন্সিল গঠিত ছিল। সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বহাল রাখে। এ বিষয়টিকে মার্জনা করা হয়। তবে ষোড়শ সংশোধনীতে বিষয়টির বিলুপ্তি ঘটে। যদিও গত প্রায় দুই বছর ধরে বিচারপতি নিয়োগে দেশে কোনো আইন নেই। এ সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া এরই মধ্যে মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। যে খসড়ায় বিচারপতি অপসারণের মূল ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়। এখন সুপ্রিম কোর্ট মূল সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায় ওই আইনটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। যদিও ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতার প্রশ্নটি নিশ্চিতভাবেই আপিল বিভাগেই চূড়ান্ত সুরাহা হবে। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও বলেছেন, সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়া হবে। (মানবজমিন)

Sharing is caring!

Loading...
Open