সহেনা যাতনা দিবস গণিয়া গণিয়া…

ইসমত পারভীন রুনু: আজ হৃদয়ের গহীনে অনাদরে জমা আছে বসন্ত স্বপ্নগুচ্ছ। ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি বাজে হৃদয় বীণায় সারাক্ষণই। ব্যস্ত, চঞ্চলময় জীবন এ মুহূর্তে গতিহীন, ছন্দহারা। শুধুই অপলক চেয়ে থাকা আর নিজের সাথে নিজেই কথা বলা। সঙ্গী কেবল অপেক্ষার প্রহরগুলো। প্রতিদিন যেন একা একা আনমনা হয়ে অদূর ভবিষ্যতের পানে চেয়ে থাকা।

ঝলমলে রৌদ্রজ্জ্বল একটি সকালের অপেক্ষায় কাটছে কানিজের বর্তমান দিন-রাত্রি। কানিজ আমার আদরের ছোট ভাইয়ের প্রিয়তমা স্ত্রী। স্বামীকে সুস্থ করার অভিপ্রায়ে ‘ওর’ জীবনযুদ্ধ, নিরন্তর সংগ্রাম আর সর্বাত্মক চেষ্টা। সঙ্গী অগণিত মানুষের ভালবাসা, দোয়া আর মহান আল্লাহ্‌পাকের অসীম দয়া।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ থেকে ‘ব্রেইন স্ট্রোক’-এ আক্রান্ত হয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ওর স্বামী। প্রিয় এ মানুষটির মুখে কথা নেই, আকণ্ঠ এক যন্ত্রণা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর হাতছানি, সেই সাথে নানারকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে মন-প্রাণ। ‘পহেলা বৈশাখ’ ছিলো ওদের দুজনের চতুর্দশ বিয়ে-বার্ষিকী। বিয়ের পর থেকেই দুজনের একসাথে পথচলা। ছেলেকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখা, সুখে-দুঃখে দুজন দুজনার। কিন্তু আজ সবকিছুই যেন এলোমেলো, পরিকল্পনাহীন। ছেলেকে নিয়ে স্বপ্নও থমকে গেছে।

জীবনে যেন কান্না ছাড়া আর কিছুই নেই। চারদিকে কত আলো, কিন্তু কানিজের চোখে প্রতিনিয়ত বিষণ্ন অন্ধকার। এ মুহূর্তে স্রষ্টার কাছে ওর চাওয়া একটাই ওর ‘স্বামী’। কবে নাগাদ কথা বলতে পারবে? স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।

নিষ্ঠা, পরিশ্রম, ধৈর্য আর নিয়মিত ঔষধ খাওয়ানো, নিবিড় যত্ন, সর্বোপরি চিকিৎসকের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলছে রোগীর পরিচর্যা। কিছুতেই যেন ওর ক্লান্তি নেই। লক্ষ্য একটাই স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে হবে। দুশ্চিন্তাগুলো কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না।

ওদের জীবনে ‘পহেলা বৈশাখ’ শুধুমাত্র নববর্ষের আগমনী বার্তা নয়, এই দিনটি ওদের জীবনের একটি বিশেষ দিন। একটি সম্পর্কের সূচনার মাহেন্দ্রক্ষণ। নতুন বছর, নতুন সূর্যোদয় আবির্ভূত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বিয়ে-বার্ষিকীর আমেজ নিয়ে নয়। এবারের পহেলা বৈশাখ এসেছে সীমাহীন কষ্ট আর অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে। এমনটি হওয়ার কথা ছিলো না। উৎসবের ছিঁটে-ফোটাও নেই, নেই আনুষ্ঠানিকতার ঘনঘটা। অথচ এ কষ্টের দিনগুলো যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না।

‘খোকন-মণি’ কী চমৎকার যুগলবন্দী (আমার ছোটভাইয়ের ডাক নাম ‘খোকন’ আর কানিজের ডাক নাম ‘মণি’)। দুই ছোটতে মিলে ওদের সুখের সংসার। তার মাঝে একমাত্র ছেলে সন্তান ‘নিহান বাবু’র আবির্ভাব যেন সুখের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার শ্রদ্ধেয়া ‘মা’ কানিজকে ‘মণি’ বলেই ডাকতেন। বেঁচে থাকলে আজকের এ পরিস্থিতি তিনি সহ্য করতে পারতেন কিনা জানি না। এমনি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আজ আমরা।

কানিজ চাকরিজীবী, প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার তাড়া, ছেলেকে তৈরি করে স্কুলে পাঠানো, শিল্পী স্বামীর দেখাশোনা, স্বামীকে তার প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে সহযোগিতা করা, পরিবারের সব বিষয়ে নিজেকে নিয়োজিত রাখা, সর্বোপরি সবকিছুতেই ওর দায়বদ্ধতা। এই একচ্ছত্র দায়বদ্ধতা কানিজকে আনন্দ দেয়। এ জীবন ওর ভীষণ পছন্দের। ঠিকঠাক চলছিলো সবকিছু। একেবারেই সাদামাটা, সহজ-সরল জীবনে অভ্যস্থ। কোথাও কোন অভিযোগ ছিলো না। নেই কোন বিরক্তি কিংবা ক্লান্তি। নিহান পঞ্চম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র, ছেলের দুরন্তপনা ঘরময়, সারাক্ষণ বাবা-মাকে অস্থির করে রাখতো, স্বামীর খুনসুটি, প্রতি মুহূর্ত, পরিচিত পথঘাট, প্রান্তর, পাখিদের কল-কাকলি, পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ, পাড়া-প্রতিবেশিদের আতিথেয়তা, ছেলের আম-কুড়ানো, লেবু, নারিকেল, আম, জাম, জামরুল, পেয়ারা গাছ থেকে পেরে খাওয়া, সবুজ প্রকৃতি, প্রশান্তির শীতল ছায়া, বাবা-ছেলের বৃষ্টিতে ভেজা, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, সবকিছুই কানিজ উপভোগ করতো। সবমিলিয়ে গ্রামীণ এ পরিবেশ ওকে খুবই আকৃষ্ট করতো। কিন্তু স্বামীর চিকিৎসার কারণে চাকরি, নিজের প্রিয় আঙিনা, সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তিন মাস ধরে ঢাকাতেই অবস্থান করছে আর দিন গুণছে। ডাক্তার জানিয়েছেন সময় লাগবে।

তাইতো আবেগ আর অনুভূতির জায়গাগুলো আগের মতো সাড়া দেয় না। তা উপলব্ধি করতে পারছে ঠিকই। এ যেন নিজের সাথে নিজের লড়াই। আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসার জোরে অপেক্ষার প্রহর গুণছে। আল্লাহ্‌পাক নিশ্চয়ই সব আগের মতো করে দেবেন।

বিভিন্ন উৎসবে-অনুষ্ঠানে যার কণ্ঠ সবাইকে আন্দোলিত, আবেগাপ্লুত করতো, মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবিষ্ট করে রাখতো; আজ সেই মানুষটি অসুস্থতার কারণে নীরব, নির্বাক, শান্ত, কোন ব্যস্ততা নেই, হাতে যেন কোন কাজই নেই। শুধু অপেক্ষার পালা। ইশারা ভাষায় দু-একবার কিছু বলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে নিজেই বিরক্ত হয়ে যায়।

আমার ছোট ভাইটি আমাদের কাছে যতটা প্রিয়, কানিজ তার চেয়ে বেশি আদরের। ওর এই দুঃসময়ে আমরাও সমব্যথী। হয়তোবা সার্বক্ষণিক রোগীর পাশে থেকে তোমাকে সঙ্গ দিতে পারিনা সত্যি, কিন্তু জেনো, আমরা প্রতিটি মুহূর্তে তোমার সাথেই আছি। তোমার যন্ত্রণায় আমরাও সমান অংশীদার। আমরা কান পেতে রই কখন শুনবো, ভাইটি আগের মতো কথা বলতে পারছে। তোমার সাথে আমরাও সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি। আমাদের প্রতিটি পরিবারে, জীবন-যাপনে ভাইটির আকস্মিক এ অসুস্থতা দারুণ প্রভাব ফেলেছে। তোমাদের বিয়ে-বার্ষিকীতে অভিনন্দন, সেই সাথে অনেক অনেক দোয়া। খুব তাড়াতাড়ি যেন তোমার স্বামী সুস্থ হয়ে ওঠে- এ প্রত্যাশা আমাদের সবার। কানিজ তুমি জয়ী হবেই ইন-শা-আল্লাহ্‌।

নরম স্নিগ্ধ সকাল তোমার জীবনে আবারও আসবে। তোমার এ অপেক্ষা পরিপূর্ণতা পাবে। আবারও বৃষ্টিভেজা বিকেলে দুজনে একসাথে ভিজবে, পাশাপাশি বসবে, আবারও জ্যোস্নারাতে তোমার ভালোলাগা, প্রিয় কোন গান তোমার স্বামীর কণ্ঠেই শুনতে পাবে।

নিঃসীম শূন্যতা থেকে বেড়িয়ে এসো। আমরা সবাই তোমার সাথেই আছি। তুমি একা নও। জীবনের প্রাণ-প্রাচুর্য তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি নির্ভীক, তুমি অপরাজিতা।

লেখিকাঃ সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সিলেট।

Sharing is caring!

Loading...
Open